আরিফ ভাই | জুবায়ের আহম্মদ

আরিফ ভাই | জুবায়ের আহম্মদ

আমার আসার খবর শুনে স্বল্প সময়ে কর্তৃপক্ষ যতটা পারে ব্যবস্থা নিয়েছে। অফিস কক্ষে গরম কফি, সাথে ৩/৪ রকমের হালকা নাস্তা। ফিল্টার না, একেবারে বোতলবন্দী মিনারেল ওয়াটারও তারা প্রস্তুত করে রেখেছে।

বাইরের ভিড়টাও আমার আসার খবর পেয়ে যায়। একজন ম্যাজিস্ট্রেট রাত নটায় না এসে সন্ধ্যা সাতটার আগেই কেন কারা ফটকে তা নিয়ে চলছে চুলছেঁড়া বিশ্লেষণ।

আরও পড়ুন: ধুপপানি ঝরনা ভ্রমণ | প্রসেনজিৎ পাল

‘স্যার এত আগে আসলেন যে? প্রথমবার বলে খুব উত্তেজিত?’, জেল সুপার বেশ রসিকতার সাথে প্রশ্ন করলেন। ভদ্রলোক রোদ পোড়া শকুনিমুখো। আমি যথাসম্ভব ব্যক্তিত্ব রেখে বললাম, ‘বলতে পারেন কৌতুহল। আমি সাইকোলজি নিয়ে প্রচুর পড়েছি। নিশ্চিত মৃত্যু জেনে যাওয়া একজন অপরাধী তার অতীত নিয়ে কী ভাবছে তাই দেখতে চাই। আশা করি আমার দেখা করার ব্যাপারে জেলকোড সম্মতি দেবে।’

১৫ মিনিট পর…
আরিফ ভাই আর আমি মুখোমুখি বসে আছি। আগে যেমন থাকতাম। ভালো আছেন প্রশ্নের বিপরীতে আরিফ ভাইয়ের সেই চেনা উত্তর, ‘এখনো অক্সিজেন অপচয় করছি রে।’ আমি পকেট থেকে সিগারেট বের করে দিলাম। আনন্দের সাথে বললেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেট মানুষ সিগারেট খাস কেন?’
‘আপনার জন্য এনেছি। আমি সিগারেট খাই না’। ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘তবে অন্য কিছু খাস। নীরার রান্নার হাত অতুলনীয় আমি জানি। বেশ শরীর জুড়েছে তোর। মেসে এসে তো খুব শুকিয়েছিলি।’
‘না শুকিয়ে উপায় ছিল? একটু দেরি হলেই তো আমাদের খাওয়া আপনিই খেয়ে নিতেন।’

আরও পড়ুন: বেনামি | রিফাত তানজিম চেতনা

অট্টহাসি দিলেন আরিফ ভাই। ধীরে ধীরে বললেন, ‘জীবনে অনেক কিছুই তো করলাম। মাফও চাইলাম খোদার কাছে। এটার জন্য বোধহয় চাইনি।’
‘আচ্ছা ভাইয়া আপনার কোনো চাওয়া আছে ?’
একজন দার্শনিকের মতো করে বললেন ভাইয়া, ‘ক্ষমতা অনেক বড়ো ব্যাপার। তাই না? ক্ষমতা আছে বলে দেখাতে চাচ্ছিস। এটা দোষের কিছু না। কথা হলো মেসটা কি আছে?’
‘আছে। আমি ডাবল ভাড়া দিই প্রতিমাসে।’
‘গুড। মেসে কাউকে পাঠাতে পারবি? গিটারটা লাগবে। কিছু গান করব দুজনে। আর আমার টেবিলের ড্রয়ারের খয়েরি মলাটের ডায়রিটাও।’
‘যেখানে নীলিমার সব কথা লেখা আছে।’ ফস করে বলে ফেললাম কথাটা। ভাইয়া কেমন একটা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ধীর কন্ঠে প্রশ্ন করলেন, ‘তোর কী ধারণা? আমি খুনি?’
আমি উত্তর দিলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর কী লাগবে বলেন?’
‘নীরাকে কিছু রান্না করতে বল। এখন এ খাবারে রুচি আসে না।’

আরও পড়ুন: দাফন | সানবির আলম

আমি সেল থেকে বেরিয়ে এলাম। কারাগারের নিয়ম চলবে এখন। নীরাকে ফোন করতেই সে আনন্দে বলে বসল, ‘ফাঁসি মঞ্চের ছবি তুলে নিয়ো কিন্তু। আর নিজে চেক করবে ও মরল কিনা। আপুকে যে মারল সেও যেন ভালো মতো মরে।’
‘ছবি নেওয়া অসম্ভব। যাই হোক, দুজনের জন্য ডিনার রেডি করো। কই মাছ ভুনা, ডাল, সাদা ভাত। চিকেন করতে পারো। আর কাঁচামরিচ অবশ্যই দেবে।’
‘কে খাবে’ প্রশ্নটাও এড়িয়ে গেলাম। বললাম এক ঘণ্টার মাঝে সব করতে। জানি মনের আনন্দে আধঘণ্টায় সব করে ফেলবে সে।

একসাথে খেতে বসলাম প্রায় চারবছর পর। আরিফ ভাই আর আমি। খাওয়া শেষে দুজনে গিটার নিয়ে বসলাম। ডায়রি থেকে নীলিমার ছবি নিয়ে অনেকটা সময় পার করলেন আরিফ ভাই। দুজন জল্লাদ এসেছে। তবে তার আগে একবার আমাকে বুকে নিলেন আরিফ ভাই। মুখে সেই হাসি। ‘ভালো থাকিস জুবু। আর নিজেকে নিয়ে একটু যত্নবান হোস।’

আরও পড়ুন: ট্রলি | তাসনিম রিমি

ফাঁসিমঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন আরিফ মাহমুদ। একজন খুনের আসামি। সবাই তা-ই জানে। কিন্তু আমি জানি, তারুণ্য বোর্ডিং হাউসের সবাই জানে আরিফ ভাই খুন করেননি। আরিফ আর খুন ঠিক তেল আর পানি। একসাথে যারা কখনোই মিশবে না। আরিফ ভাই খুন করেছেন সত্যকে। কেবল একজন বাবাকে বাঁচাতে তিনি হাসিমুখে খুন করেছেন এক অন্ধকার রাতের সত্যকে।

গল্প: আরিফ ভাই

লেখক: জুবায়ের আহম্মদ

প্রথম প্রকাশ: গল্পীয়ান ও সাহিত্যের সাতকাহন সম্পাদিত গল্প সংকলন ‘গল্পোদ্যান’ এ প্রকাশিত।

 

আরও পড়ুন: অতৃপ্ততা | এম.এ মুহ্সী রহমান অর্ণব

মন্তব্য করুন: