জোছনাযুদ্ধ | সোহেল নওরোজ

জোছনাযুদ্ধ | সোহেল নওরোজ

শেষ যেবার আদৃতাকে দেখেছিল অনিকেত, মনে হয়েছিল ভরা পূর্ণিমার আকাশে কর্তৃত্ব করা একফালি চাঁদ শূচি জোছনা ছড়াচ্ছে। মানুষ যে চাঁদের আভিজাত্য ধারণ করতে পারে, আদৃতাকে না দেখলে জানা হতো না। এ বাড়িতে এলেই ছাদে চলে যায় অনিকেত। আদৃতাদের ছাদটা খুব প্রিয় তার। যেখান থেকে তরিয়ে উপভোগ করা যায় রাতের আকাশের সৌন্দর্য। চাঁদের আলো সত্যিই বাঁধ ভাঙে সেখানে। আদৃতার পরিচর্যায় টবে লাগানো ফুলগাছগুলো যেন সজীব প্রাণের প্রতিচ্ছবি। দুটো বড়ো আমগাছ কেবল পশ্চিম কোনে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে অল্পবিস্তর অন্ধকার জড়ো করে রেখেছে। অনিকেত হাস্যোচ্ছলে একবার বলেছিল, আমরা যদি কখনো প্রেম করতাম, মনের কথা খুলে বলার জন্য ওই গাছের ছায়া বেছে নিতাম। আদৃতা সে সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছিল, তোমার সঙ্গে প্রেম করছি জানলে এ বাসাতেই ঢুকতে দিত না, ছাদ তো দূর অস্ত!

আরও পড়ুন: আড়ি | আবুল হাসনাত বাঁধন

অনিকেত, আদৃতা আর পল্লব একই বিষয়ে পড়ত। অনার্স শেষ করার পর তারা উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তির আবেদন করে। পল্লবেরটা গৃহীত হয়। এতদিন ইতস্তত করে আদৃতাকে যা বলা হয়নি, সাহস করে তা বলে দেয় পল্লব। আদৃতাকে সে পছন্দ করে। বিদেশে পাড়ি জমানোর আগে বিয়ের কাজটা সম্পন্ন করে যেতে চায়। পরে সময়-সুযোগমতো আদৃতাকেও সেখানে নিয়ে যাবে। মেয়েরা প্রেমের বিষয়ে যতটা খুঁতখুঁতে বিয়ের ব্যাপারে বোধ হয় ততটা নয়। কিংবা তারা হয়তো সাহসী ছেলে পছন্দ করে, যারা অকপটে ভালো লাগার কথা বলতে পারে। তাছাড়া পল্লবের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার অনেকটাই কেটে গেছে। ‘না’ বলার আপাত কোনো কারণ খুঁজে পায় না আদৃতা। বেশ সাড়ম্বরেই ওদের বিয়ে হয়ে যায়।

আরও পড়ুন: আত্মজা | আবুল হাসনাত বাঁধন

একটা চাকরি জুটাতে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়ে অনিকেত। আদৃতাদের সঙ্গে যোগাযোগ অনিয়মিত হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে ফেসবুকে আলাপ হয়, এই যা। সেদিন হঠাৎ আদৃতার একটা স্ট্যাটাস দেখে চমকে ওঠে অনিকেত। ‘জোছনার জন্য অপেক্ষা করে চাঁদটাই শেষে ডুবে গেল!’ নিচে পল্লবের সঙ্গে ওর বিয়ের আপলোড করা ছবিতে লেখা- ‘যে ছবি এখন শুধুই স্মৃতি!’ খোঁজ নিয়ে অনিকেত জানে, আদৃতাকে কাছে নিয়ে যাওয়ার সব প্রস্তুতি যখন শেষের পথে তখনই ঘটে দুর্ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে ব্রেইন স্ট্রোক করে পল্লব। হাসপাতালে তিন দিনেও জ্ঞান ফেরে না। উলটো পাড়ি জমায় না-ফেরার দেশে!

আরও পড়ুন: উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ | আবুল হাসনাত বাঁধন

অনেকদিন বাদে অনিকেত আজ আবার আদৃতাদের বাড়ির ছাদে। সবকিছু সেই আগের মতোই আছে। আকাশজুড়ে আস্ত চাঁদ তার জ্যোতি ঠিকরাচ্ছে। ফুলগাছগুলোও জীবন্ত। ব্যতিক্রম কেবল আদৃতা। এ কয়দিনে কেমন মলিন হয়ে গেছে। চোখে-মুখে অমাবশ্যার অন্ধকার। দুঃস্বপ্নের ঘোরলাগা কণ্ঠ, ‘আমার কথা বাদ দাও। তুমি কবে সংসার পাতবে?’ উত্তর জানা নেই অনিকেতের। শুধু এটুকু বুঝছে এ মুহূর্তে জোছনা ফাঁকি দিয়ে আমগাছের ওই ছায়াতে কারও হাত ধরতে প্রচণ্ড ইচ্ছে করছে। সেটি কার হাত? আদৃতার!

আরও পড়ুন: বই পড়ার মধ্যমে হতাশা থেকে মুক্তি!

গল্প: জোছনাযুদ্ধ

লেখক: সোহেল নওরোজ

প্রথম প্রকাশ: গল্পীয়ানসাহিত্যের সাতকাহন সম্পাদিত গল্প সংকলন ‘গল্পোদ্যান’ এ প্রকাশিত।

*****

প্রিয় পাঠক, ‘জোছনাযুদ্ধ’ – গল্পটি ভালো লাগলে পরিচিত বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। সোহেল নওরোজের লেখা ‘জোছনাযুদ্ধ’ এর মতন আরও নতুন নতুন গল্প পড়তে চাইলে উইকিহাউ৩৬০ তে যুক্ত থাকুন।

আরও পড়ুন: সেরা ৫টি ফ্রি সিএমএস প্ল্যাটফর্ম!

One thought on “জোছনাযুদ্ধ | সোহেল নওরোজ”

মন্তব্য করুন:

%d bloggers like this: