ট্রলি | তাসনিম রিমি

ট্রলি | তাসনিম রিমি

রাত প্রায় দুটোর দিকে স্বাদের ঘুমটা ভেঙে দিলো রফিক ছেলেটা। এমনিতেও খুব একটা ঘুম আমার হয় না। মাঝে মাঝে খুব শখ করে একটু আধটু ঘুমাতে আসি তাও ভেস্তে যায়। ওহ্ আমার কথা তো বলা হলো না, আমি ট্রলি। আমার স্বজাতি ভাইদের মধ্যে আছে স্ট্রেচার আর হুইল চেয়ার। তবে এ হাসপাতালে স্ট্রেচার আর আমার মতো দেখতে ট্রলি নামক আরও দুটো ক্লোন আছে। তাদের একজনের পা নেই, অন্যজনের পেট কাটা। তাই রাত দুপুরে আমারই জরুরি তলব পরে।

আরও পড়ুন: ধুপপানি ঝরনা ভ্রমণ | প্রসেনজিৎ পাল

গত রাতেও এক ঘাটের মরা এসে হাজির হয়েছে। তাই টানতে টানতে আমাকে নিয়েই হাজির রফিক। এ ছেলেটাও এক বদের হাড্ডি। কথা নেই বার্তা নেই সামান্য কটা টাকার বিনিময়ে বিকিয়ে দেয় আমার সম্মান বোধ। ওরে দোষ দিয়ে অবশ্য লাভ নেই। রোগীর আত্মীয় স্বজনগুলো যখন কোনো পথ দেখে না, তখন হাতের ফাঁকে গুজে দেয় দু-চার টাকা। সে লোভেই তো অভাবের সংসারের বাড়তি আয়ের আশায় বড়ো বড়ো রাঘব বোয়ালের সাথে এ চুঁনোপুটিগুলোও আমাকে বিকিয়ে খাচ্ছে।

আরও পড়ুন: বেনামি | রিফাত তানজিম চেতনা

এইতো সেবার বড়ো স্যার পাঁচটা করে বেড, স্ট্রেচার, চেয়ার, ট্রলির জন্য পাশ হওয়া টাকায় সাইন করে নিলো। কিন্তু দুটো বেড আর একটা হুইল চেয়ার ছাড়া নতুন কারও মুখ দেখলাম না। ইশ্ নতুন কেউ আসলে আমার খাটুনিটা একটু কমত। এই যা আবার ডাক আসলো আমার। ঘাটের মরা বুড়োটার জন্য কষ্ট হচ্ছে খুব। একটু আগে পায়ের গোড়ালি টেনে সোজা করে রড ঢুকিয়ে দিয়েছে। এখন টানা দিয়ে বেঁধে সোজা বেডে শুইয়ে দেবে। চোখের কোনা দিয়ে নোনতা জল ফেলে আমার শরীরটা ভিজিয়ে দিচ্ছে। বড়ো ছেলেটা সাথে এসেছে। গত রাতে বাথরুমে যাওয়ার সময় পেছন থেকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল বড়ো বৌ। ঘাটের মরা না হলে অমন আছাড়ের পর কেউ বাঁচে না! অথচ, বুড়োটার কেবল পা ভেঙেছে। গেট থেকে আসতে আসতে বুড়ো এসবই ভাবছিল তাই জেনে গেলাম আমিও। সবার মনের কথাগুলো কত স্পষ্ট শুনতে পাই আমি! অথচ, আমার কথা কেউ শুনতে পায় না।

আরও পড়ুন: দাফন | সানবির আলম

সেন্টু দারোগা যখন একে একে সবাইকে জেরা করতে লাগলো ওইবার সেই সুইসাইড কেসটা নিয়ে। কত লোক জানত সত্যিটা কিন্তু টাকার লোভ আর চাকরির ভয়ে সবগুলো চুপ করে গেল। আমি যে গলা ফাটিয়ে বললাম মেয়েটাকে বালিশ চাপা দিয়ে মেরেছে, কেউ তা কানেও নিলো না। মর্গের কত বেওয়ারিশ লাশ যে আমার পিঠে করে পাচার করল তার তো হিসেব নেই। মাঝে মাঝে বিভৎস চেহারার কিছু লোক আসে থেঁতলে যাওয়া মাথা বা বিকৃত চেহারার। কান্নার রোল পড়ে যায়। আহাজারি করে কাঁদতে থাকে প্রিয় মানুষগুলো। আমারও মনটা ভারি হয়ে যায় কখনো সখনো প্রলাপ শুনে। হঠাৎ হঠাৎ দু সেকেন্ড শ্বাস ফেলার সময়ও হয় না।

আরও পড়ুন: আরিফ ভাই | জুবায়ের আহম্মদ

দুপুরের দিকে সেদিন একটু গা এলিয়ে শুয়েছি অমনি কেমন একটা কাঁপুনি দিয়ে উঠল টের পেলাম। ভাবছিলাম বিশ্রামের অভাবে বুঝি এমনটা হচ্ছে তাই আর গা না করে চোখ বুজলাম। ঘণ্টাখানেক বাদে কী সব হুরোহুরি টানাটানির শব্দ। ভাঙা খোড়া স্ট্রেচার, ট্রলি সব নিয়ে ছুটছে। যাদের অবস্থা একটু ভালো কোলে করেই আনছে। মিনিট দশেকের মাঝে হাসপাতালটা মানুষে গিজগিজ করে উঠল। ভূমিকম্প না কী হয়েছে বিল্ডিং চাপা পড়ে লোকগুলোর বেহাল অবস্থা। কারও হাত নেই, পা কাটা। রফিক অবশ্য এবার কোনো টাকা নেয়নি কারও কাছ থেকে। রকেটের বেগে আমাকে নিয়ে ছুটছে আর বারান্দা ফ্লোর সব রোগী দিয়ে ভর্তি করে ফেলছে। এত ঘিঞ্চি জায়গায়ও খুব সাবধানে পা ফেলছে যাতে কারও আঘাত না লাগে। ইচ্ছে করলে অনেক টাকা বখশিশ নিতে পারত, এবার নেয়নি ছেলেটা।

আরও পড়ুন: অতৃপ্ততা | এম.এ মুহ্সী রহমান অর্ণব

পানির পাম্পে সমস্যার কারণে গত বছর যখন ডায়রিয়া কলেরা রোগীতে এমনই হাসপাতাল ভরে উঠছিল; তখন বাইরে থেকে কয়েকজন ডাক্তার আর ভলান্টিয়ার নামের কিছু ছেলেমেয়ে এসে অনেক খাটুনি দিয়েছে। এবারও নিশ্চয় আসবে। ভলান্টিয়ার নামের মানুষগুলা ভালো হয়। আমার মতো ওরাও যেন সব রোগীদের কষ্টের না বলা কথা শুনতে পায়। নিজের কাঁধে করে সব বোঝা বয়ে নিতে ওদের কোনো ক্লান্তি আসে না। ইশ মুখ থেঁতলে যাওয়া এক বাচ্চা এসেছে। ওর মায়ের একটা হাত কাটা গেছে সিঁড়ির নিচে পড়ে। আমারও শরীরটা খারাপ যাচ্ছে কদিন ধরে। শুনছি নতুন কিছু ট্রলি দিবে সরকার।

গল্প: ট্রলি

লেখক: তাসনিম রিমি

প্রথম প্রকাশ: গল্পীয়ান ও সাহিত্যের সাতকাহন সম্পাদিত গল্প সংকলন ‘গল্পোদ্যান’ এ প্রকাশিত।

One thought on “ট্রলি | তাসনিম রিমি”

মন্তব্য করুন:

%d bloggers like this: