দাফন | সানবির আলম

দাফন | সানবির আলম

তখনো রাতের দখল যায়নি। আঁধার কেটে কেবলি মাত্র ভোরের আবছা আভা জেগে উঠেছে। পাখিগুলো কিচিরমিচির ডেকে চলেছে। সুবেহ সাদিকান্তে পূব আকাশে দেখা মিলছে প্রভাতীর। জন্মলগ্নের সূর্যটা এইতো উঁকি দেবে বলে। দিনের আলো যতই বিস্তীর্ণ হতে থাকল, রাস্তার পাশের ওই জরাজীর্ণ বাড়িটায় মানুষের ভিড় ততই বাড়তে লাগল। শনপাতা দিয়ে বানানো ঘরের এককোনে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে ছেলেটা। নিশ্বাসের শব্দ ছাড়া সবকিছুই নিশ্চুপ। সামনে পাটের তৈরি নকশী পাটিতে শুয়ে আছে তার বাবা। মাথা ও পায়ের কাছে ধোঁয়া ছেড়ে অবিরত নিজেকে পুড়িয়ে চলেছে আগরবাতি।

আরও পড়ুন: আড়ি | আবুল হাসনাত বাঁধন

এ সংসারে সুমনের স্বজন বলতে কেউ নেই। একমাত্র বাবাই ছিল তার শেষ ভরসা। আজ বাবাও চলে গেছে। বাইরে চলছে প্রতিবেশীদের গুঞ্জন। কথা হচ্ছে, তাড়াতাড়ি লাশটাকে দাফন করতে হবে। নিজের জন্মদাতা পিতাকে লাশ বলাতে সুমনের বুকটা কেঁপে ওঠে। একটু আগেও বাবার সাথে কথা হয়েছে তার। চামচ দিয়ে মুখে পানি তুলে খাইয়ে দিয়েছে। বাবা বলেছিল ঘুমোবে। এইতো ঘুমিয়ে আছে। ঘুমন্ত কাউকে কি কেউ লাশ বলে? ভেতরটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে তার।

কয়েকজন এসে বলল, ‘বেলা তো বয়ে গেল। কাফন দাফনের ব্যবস্থা করা লাগে যে।’ সুমন উঠে দাঁড়ায়। কয়েকজনকে নিয়ে লাশটা বাইরে বের করে নিয়ে আসে। কেউ কেউ বড়ই আর বাঁশপাতা নিয়ে পানি গরম করার কাজে লেগে পড়ে। কথা উঠে কবর নিয়ে। তার তো কোনো জমিজমা নেই। সিদ্ধান্ত হয়, ঘরের সামনেই কবর খোঁড়া হবে। তাতে আপত্তি জানায় করিম চাচা। দয়া করে থাকতে দিয়েছে, তাই বলে তো আর কবরের জায়গা দেওয়া যায় না! অবস্থা শোচনীয় দেখে সুমন ছুটে যায় মাতব্বরের কাছে। মুরব্বি মানুষ উনি। নিশ্চয়ই কোনো সমাধান দেবেন। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। আশায় মরীচিকা পড়ে গেল।

আরও পড়ুন: আত্মজা | আবুল হাসনাত বাঁধন

এদিকে বাবার কাফনের ব্যবস্থা প্রায় শেষ। এখনো কবরের ব্যবস্থা করা গেল না। সুমন আবার ছুটে গেল করিম চাচার কাছে। অনেক হাতে পায়ে ধরল, অনেক কাঁদল। করিম চাচার মন গলাতে পারল না। সাফ সাফ বলে দিলো, জায়গা দিতে পারবে না। এবার সুমন গ্রামের অন্য সবার কাছে হাত পাতে। কেউ তার হয়ে এগিয়ে এলো না। তা ছাড়া ভিটেমাটি ছাড়া ওদের তো তেমন কোনো জমি জায়গা নেই যে সুমনের বাবার জন্য এক টুকরো জমি দেবে। ওরা নিজেরাও অন্যের জমিতে বর্গা ফসল করে কোনো রকম দিন কাটায়।

সারাবেলা পার করে সন্ধ্যা হতে চলেছে। সবাই যার যার মতো করে নিজের বাড়িতে চলে গেছে অনেক আগেই। সাদা কাফনে জড়ানো লাশের পাশে একা একা বসে আছে সুমন। গোধূলির আভা তখন আঁধারে মিলিয়ে গেছে। সুমন উঠে দাঁড়ায়। নিজের বাবার লাশ পাজা কোলে নিয়ে হাঁটা শুরু করে। এক সময় নদীর পাড়ে এসে থেমে যায়। শরীরটা ঘামছে খুব। তারপর লাশটা ভাসিয়ে দেয় নদীতে। ভাসতে থাকে পানিতে। অন্ধকারে যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ তাকিয়ে থাকে বাবার লাশের দিকে। হঠাৎ লাশটা নড়ে ওঠে। শত কষ্টেও সুমন হেসে ফেলে। আল্লাহর দেওয়া জমিতে না হয় তার বাবার জায়গা হলো না, এবার তো হয়েছে; মাছের পেটে।

আরও পড়ুন: বেনামি | রিফাত তানজিম চেতনা

গল্প: দাফন

লেখক: সানবির আলম

প্রথম প্রকাশ: গল্পীয়ান ও সাহিত্যের সাতকাহন সম্পাদিত গল্প সংকলন ‘গল্পোদ্যান’ এ প্রকাশিত।

*****

প্রিয় পাঠক, ‘দাফন’ – গল্পটি ভালো লাগলে পরিচিত বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। সানবির আলমের লেখা ‘দাফন’ এর মতন আরও নতুন নতুন গল্প পড়তে চাইলে উইকিহাউ৩৬০ তে চোখ রাখুন।

আরও পড়ুন: ধুপপানি ঝরনা ভ্রমণ | প্রসেনজিৎ পাল

4 thoughts on “দাফন | সানবির আলম”
  1. খুবই মর্মান্তিক গল্প! আবেগ আপ্লুত হয়ে গেলাম! সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

মন্তব্য করুন:

%d bloggers like this: