স্কুল | আবুল হাসনাত বাঁধন

স্কুল | আবুল হাসনাত বাঁধন

‘এটাই! হ্যাঁ এটাই! এটাই আমাদের বিজিসিএ। আমাদের প্রাণের বিদ্যাপীঠ। এর প্রতিটি পরত আমার খুব চেনা। খুব, খুব আপন! এর পাশ দিয়ে একটা ক্ষীণ স্রোতসীনি বয়ে গিয়েছিল। সে আসলে নদী ছিল না। কারণ তখনও সে সাগরের দেখা পায়নি। বর্ষা এলেই ফুলে উঠত, শীতে হারিয়ে যেত। খালই বলা যায়। আমি ওর নাম জানতাম না। নামহীনাকেই ভালোবাসতাম। সেও আমাকে ভালোবাসত। ঝুম বর্ষায়, যখন আমি তার পাড়ে গাছের ছায়ায় বসে পা মেলে দিতাম, তার জল এসে আমার পায়ে চুমু এঁকে দিত। এটাই তো ভালোবাসা!

এই যে আমাদের স্কুল, এখানে অনেক নারিকেল গাছ ছিল। মনে আছে, একবার মাহমুদ গাছে উঠে ছ’টা ঝুনো নারিকেল চুরি করেছিল। আমাদের সবার ভাগে একটা করে পড়েছিল। বিশ্বাস করুন এমন অমৃত নারিকেল আমি জীবনেও খাইনি। জলগুলো ছিল বেহেশতের শরবতের মতো। এখানে আমড়া আর বরই গাছও ছিল। ওগুলোও হজম করেছে আমাদের পাকস্থলী। আর, আর একটা জামগাছ ছিল। অনুপম স্যার একবার নিজ থেকেই খেতে দিয়েছিলেন জাম। সেবারই ছিলাম আমরা স্কুলের শেষ ব্যাচ। স্কুলের সব কিছুই কেন যেন স্বর্গীয় মনে হতো। বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম, স্কুলের পেছনের পেয়ারাগুলো আরও চরম স্বাদের ছিল।

আরও পড়ুন: গঙ্গাফড়িং ও প্যাঁচার গল্প | আবুল হাসনাত বাঁধন

এই স্কুলে আমার ৬৩ জন বন্ধু বান্ধবী ছিল। সবাই কই? কেউ নেই আজ! হারিয়ে গেছে। উর্মির নাকি এসএসসির পরপরই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল! সত্যি নাকি? আচ্ছা ডাক্তার হয়েছে কজন? ইঞ্জিনিয়ার? ভার্সিটিতে কতজন পড়েছে? আমার মতো দিশাহীন বাউণ্ডুলে আর কেউ কি আছে? এতগুলো সমীকরণ আমি আজ মেলাতে পারছি না! যেমন ৩৬ বছর আগে মেলাতে পারিনি আমার আর সাদিয়ার সমীকরণ। কেন জানি ওকে ভীষণ রকম ভালোবাসতাম। শুনে অদ্ভুত মনে হতে পারে যে, আমি ওকে হাই স্কুলে পা দেবার আগেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম। আমার কোনো কিছুর মোহ ছিল না, ছিল শুধু ওর চেহারার প্রতি টান। ওর মুখটায় প্রচণ্ড মায়া কাজ করে। এখনো। সাদা রং ধরা চুলের মাঝে, চুপসানো ত্বকের চেহারাটা এখনো আমাকে বাধ্য করে বেহায়া, নির্লজ্জ হতে। সেই কবে থেকে দেখে আসছি চেহারাটা, এখনো পুরানো হয় না। ক্লাসের ফাঁকে চুপি চুপি দেখতাম ওকে। কতবার যে চোখচোখি হয়েছে নিজেও জানি না! এখনো ওর চেহারাটা প্রতিদিন নতুন নতুন লাগে! আসলে মানুষের বয়স বাড়ে, কিন্তু মনের বয়স কমে! মানুষ বৃদ্ধ হয়, চুলে পাক ধরে, চামড়া শুকিয়ে যায়, কিন্তু ভালোবাসা বৃদ্ধ হয় না। ভালোবাসা চিরনবীন! আচ্ছা, ওর স্বামী কি ওর চেহারাটা দেখেছিল আমার মতো করে? নাকি সারাজীবন দেহভোগেই কাটিয়েছে? যাই হোক, জানার ইচ্ছে নেই আমার।

আরও পড়ুন: বই পড়ার মধ্যমে হতাশা থেকে মুক্তি!

এই যে স্কুলের পেছনের বড়ো মাঠটা, এখানে সবুজ দূর্বাঘাস আর লজ্জাবতীতে প্রেম হতো। আমরা লজ্জাবতীর লজ্জা দেখে আনন্দ পেতাম। এই মাঠেই শরৎ আসত শুভ্র কাশফুলের বিছানা সাজিয়ে। মাঠের মাঝখানেই ছিল আমাদের ‘চীনের মহাপ্রাচীর’ নাম দেওয়া দেয়ালগুলো। টিফিন ছুটিতে এখানে রোজ আড্ডার আসর বসতো। আমরা নানান গল্পে মেতে উঠতাম। জীবনের কত রং! সব রং তখন আমাদের গায়ে। আমরা তখনও জীবনকে বুঝতে শিখিনি। তাই আড্ডায় কোনো দুঃখের গল্প হতো না। সব ছিল সুখ আর স্বপ্নের। আড্ডার টপিক অধিকাংশ সময়ই ছিল মেয়ে। স্কুল পড়ুয়া ছেলেদের মেয়ে নিয়ে খুব কৌতুহল থাকে। তবে আমার সব কচি আবেগ জমা হয়েছিল একজনকে কেন্দ্র করেই।

এই, বাম পাশেই ছিল আমাদের মেডিকেল আর মেডিকেল কলেজ। একবার ব্যবহারিক ক্লাসে হুট করেই নাইমা বেহুঁশ হয়ে পড়ে গিয়েছিল। তখন ওকে এই মেডিকেলেই নেওয়া হয়েছিল। মেডিকেলের তিনতলার ছাদ ছিল আমাদের এভারেস্ট। আমরা প্রায়ই কঠিন, সর্পিল সিঁড়ি বেঁয়ে ছাদে উঠে এভারেস্ট জয় করতাম। মেডিকেলের পাশেই ছিল আমার আর হিমাংশুর বসার জায়গা। এই ছোট্ট বর্গাকার জায়গাটায় আমরা কতশত স্বপ্ন এঁকেছিলাম আজ তার হিসেবও নেই। জায়গাটা ছিল বৈচিত্রে ভরপুর। ছোট্ট জায়গাটাতেই ছিল শত শত প্রজাতির উদ্ভিদ আর প্রাণী। আমি আর হিমাংশু স্রষ্টার ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হতাম। হিমাংশু আর পিয়া ভালো গান গাইতে পারত। ওদের গানের সুরে আমি মুগ্ধ হতাম। আজ ত্রিশ বছেরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, তাদের গান শুনতে পাইনি। আমি এখনো কান পেতে থাকি ওদের গান শোনার জন্য। আচ্ছা, আমি মরে যাবার পরও কি ওদের বৃদ্ধ কণ্ঠে করুণ সুর ওঠবে না?

আরও পড়ুন: প্রেমের কবিতা | ফেরদৌস আহমেদ 

ফারিনকে চিনেন? ওই যে, যাকে আমরা ‘ব্যাঙ’ ডেকে ক্ষেপাতাম। একবার তো আমি ক্লাসে তেলেপোকা এনে ছেড়ে দিয়েছিলাম ওর গায়ে। সে কেন জানি আমাদেরকে মাফ করে দিয়েছিল। রাগ পুষেনি কারওর ওপরেই। কীই বা হয় রাগ পুষে? সারাজীবন কেউ তো থাকে না। একসময় সবাইকেই চলে যেতে হয়। ভার্সিটি পাস করার পর আর দেখা হয়নি ওর সাথে। আচ্ছা, ওর কি নাতি-নাতনি আছে? কী নাম দেবো ওদের? ‘ব্যাঙাচি’?

তুহিনটা নাকি স্কুল থেকেই সিগারেট খেত? সিগারেটে কি খুব স্বাদ পাওয়া যায়? আমি তো ট্রাই করতে পারিনি কখনো। পরে অবশ্য কার জন্যে নাকি খাওয়া বাদ দিয়েছিল সে। আসলেই ভালোবাসাগুলো পবিত্র হয়। নিকোটিনের ধোয়া সেখানে বাতাসকে বিষাক্ত করতে পারে না! আমাদের কৃষ্ণকলি, এইচএসসি পাস করে সেই যে হারালো এখনো খুঁজে পাইনি! কৃষ্ণকলি মানে বৃষ্টির কথা বলছিলাম। ওর এই এপিক নামটা রেখেছিল বাংলা স্যার। নামটা জানি কী ছিল স্যারের? ভুলে গেছি!

আরও পড়ুন: পই পই করে হিসাব রাখছি | সাখাওয়াত হোসেন

ফয়সাল আর তোফার কবিতা লেখার হাত ছিল। অনবদ্য সব কবিতা লেখত ওরা। আমি মুগ্ধ হয়ে পড়তাম ওদের লেখা। প্রতিটা অক্ষর, প্রতিটা ছন্দ কথা বলত। আজ কত বছর হলো ওদের কবিতার অন্ত্যমিলে বুঁদ হই না। সুষ্ময়কে ভীষণ মনে পড়ে আমার! সারাজীবন পাশে ছিল সে। একবার রাঙামাটি বৌদ্ধ বিহার থেকে ফেরার পথে অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। আমাকে এভাবে একা রেখে চলে যাবে কল্পনাও করিনি! সৌরভ, সে অনেক বছর ধরে কোনো খোঁজখবরও নেই না। ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। আর সুজা, সুজাকে কত বছর হলো বাঁকা ডাকি না! সে কি এখনো কমপ্লেইন খায়? ওর সৌষ্ঠব শরীরটা কি এখন হারিয়ে গেছে বৃদ্ধতায়?

জানেন? আমাদের ক্লাস ছিল একেবারে পূর্ব কোনায়। ক্লাসের পাশেই ছিল একটা ঝাঁকড়া কদম গাছ। বর্ষা এলেই কদমে ভরে যেত গাছটা। আমি আর হিমাংশু ছাদ থেকে কদম ছিঁড়ে নিতাম প্রতিদিন। অসংখ্য কদম ফুল দিয়ে ক্লাসের মধ্যেই সবাই ‘বুম ফাইট’ নামক খেলা খেলাতাম। তখনো আমরা ফুলকে ভালোবাসতে শিখিনি। ফুলের সৌন্দর্য অনুভব করতে শিখিনি।

মুকিত কে চিনেন? ওই যে গোলগাল চেহারার ছেলেটা, যে হলুদ পাঞ্জাবি পড়ে সারাক্ষণ হিমু হবার চেষ্টায় মত্ত থাকত। হিমুকে চেনেন তো? হিমু আমাদের সময়ের সেরা ঔপন্যাসিক ‘হুমায়ুন আহমেদ’ এর সৃষ্ট অমর চরিত্র। আচ্ছা খালি পায়ে রাস্তায় হেঁটে মুকিত কি সত্যিই হিমু হতে পেরেছিল? নাকি জীবনের কঠিন বেড়াজালে আটকে পড়েছিল। জানি না! তবে কোনোদিন যদি ওর দেখা পাই, তাহলে আমি ওকে হিমু বানিয়েই ছাড়ব। অন্তত একদিনের জন্য হলেও!

আরও পড়ুন: আড়ি | আবুল হাসনাত বাঁধন

নাইমুল সাহেব অনেক বকবক করে ফেলছি। আর কথা না বাড়িয়ে চলুন ফিরে যায়। এখানে কিছুই নেই! সব বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মানুষেরই স্থায়ীত্ব নেই, সে হিসেবে এগুলো তো কিছুই নয়। তবে আমরা স্কুলকে বড্ড বেশি ভালোবাসতাম। স্কুলের প্রতিটি দেয়ালে আমাদের স্পর্শ লেগে ছিল। প্রতিটি আনাচে কানাচে ছিল আমাদের ঘ্রাণ। এখনো আমার চিৎকার করে জুলফি, খাদেম, মাস্টর, দুলাভাই, বডি, ওলা, ভাইরাস, ককটেল, আপা, প্লাস্টিক… ইত্যাদি নামগুলো ধরে ডাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কোথাও তো কেউ নেই। হারিয়ে গেছি সবাই। বদনা ডাকটাকে মিস করি খুব। মিস করি সুমন স্যারের- “সায়েন্সের ছেলেরা এরকম করতে পারে না বলছি!!! আজকে শেষ! আজকে শেষ!” কথাগুলোকেও। আমার জীবনে দেবদূত হয়ে আর কখনো কোনো দেবদূত স্যার আসেননি আমাকে প্রেরণা জোগাতে! আলাউদ্দীন স্যারও চলে গিয়েছিলেন খুব দ্রুত। অঞ্জু ম্যাম, , সুচিত্রা ম্যাম, লাকি ম্যাম, শর্মিলা ম্যাম, পারমিতা ম্যাম, উনারা ছিল আমার মায়ের মতোই। আইনুন্নাহার ম্যামের কড়া শাসনগুলো কখনো ভুলতে পারিনি। আমি কিছুই ভুল পারব না। আমার বৃদ্ধ মস্তিস্ক নতুন কিছু গ্রহণ করে না, পুরোনোগুলোকেই আজীবন আগলে রাখে। আমার কুচকানো চামড়ার বৃদ্ধ হাত অতীত হাতড়াতে না পারলেও, আমার ঝাপসা শূন্য দৃষ্টি এখনো তাকিয়ে থাকে স্মৃতির পাতায়।

নাইমুল সাহেব, বিশ্বাস করুন আমি শুধু একবার, হ্যাঁ শুধু একবার অতীতে ফিরে যেতে চাই! ফিরে পেতে চাই, স্কুলে ফেলে আসা আমাদের সেই স্বপ্নময় দিনগুলো!’

‘স্কুল’ | © আবুল হাসনাত বাঁধন

রচনাকাল: (০২/০৬/২০১৬)

স্থান: কোতোয়ালি, চট্টগ্রাম।

উৎসর্গ: গল্পের স্থান ও চরিত্রগুলোকে।

*****

প্রিয় পাঠক, স্কুল – গল্পটি ভালো লাগলে আপনার স্কুলের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। আবুল হাসনাত বাঁধনের লেখা ‘স্কুল’ গল্পটির মতন আরও নতুন নতুন গল্প পড়তে চাইলে উইকিহাউ৩৬০তে চোখ রাখুন।

One thought on “স্কুল | আবুল হাসনাত বাঁধন”
  1. আহা, সেই দিনগুলো! কত মধুর ছিল! স্কুল জীবনের কথা মনে পড়লেই নস্টালজিক হয়ে যাই।

মন্তব্য করুন:

%d bloggers like this: